আত্মকথন : মা

0


আজ আমি মাকে নিয়ে লিখব। মা। আমার মা। 

অফিস থেকে ফিরে আজ সন্ধ্যেয় গরম পানি দিয়ে গোসল নেবার প্রস্তুতি চলছিল । ডেকচিতে ছিল ফুটন্ত গরম পানি। অসাবধানতায় একটু পানি ছলকে পড়েছিল পায়ের পাতায়। চেঁচিয়ে উঠি আমি। মা বোধ হয় তখন চা বানাতে ব্যস্ত। আওয়াজ শুনে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসলেন । দরজায় ঠকঠক আওয়াজ তুলে বলে উঠলেন, আবার কি গরম পানি গায়ে ফেললি নাকি ?

অনেক বছর আগে একবার বাথরুমে আনমনে ফাইটিং ফাইটিং খেলতে খেলতে গোসল করছিলাম। খেলার ছলে ভুলে সেদিন ডেকচির ফুটন্ত গরম পানি নিজের অজান্তেই শরীরে ঢেলে দিয়েছিলাম আমি। তারপর সে কি যন্ত্রনা! মা ব্যস্ত হয়ে এটা করছিল, ওটা করছিল । চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ছিল জল। একটু পর পর আমার মাথাটাকে চেপে ধরছিলেন নিজের বুকে। যেন চেপে ধরলেই আমার যন্ত্রনা ভাল হয়ে যাবে। শাররীক যন্ত্রনা কমাতে পারেন নাই বটে কিন্তু শরীরের যন্ত্রনা ঠেলে চোখ ফুটে কেবল জলই গড়িয়েছে। আজও সে কথা মনে হলে চোখটা ঝাপসা হয়ে উঠে। 

আমি মায়ের বড় সন্তান। এ ছোট জীবনে উনার ছোট শরীর থেকে বেরিয়েছিলাম আমরা চার ভাই। এর মাঝে একজন জন্মের দু-তিন দিনের ভেতরই মারা যান। খুব ছোট ছিলাম আমি তখন। সে ভাইটিকে দেখতে গিয়ে রিকশা থেকে বাবা সহ ছিটকে পড়েছিলাম। একদিকে এক সন্তান হারানোর বেদনা আর অন্য দিকে বেঁচে থাকা ছেলেটির হাত-পায়ের উঠে যাওয়া চামড়ায় হাত বুলিয়ে ছেলেটার কষ্ট লাঘবের চেষ্টা- এ কেবল একজন মায়ের পক্ষেই সম্ভব। 

ক্লাশ নাইনে থাকার সময় আমার মায়ের বিয়ে হয়। মা সেবার ক্লাশ টেন পাশ না করেই ম্যাট্রিকটা দিয়ে ফেলেন। পাশ করেন। বিবাহের সাথে সাথে অবশ্য লেখাপড়ারও ইতি ঘটে তার। আমার দাদু বাড়িতে উনার জীবনের শুরুটা ভাল কাটেনি। এর মূল কারন পরিবেশ। নানার বাড়ির তুলনায় দাদু বাড়ির পরিবেশ অনেকটাই রক্ষনশীল ছিল। তার চেয়েও বড় কথা উনি ছিলেন সে বাড়ির প্রথম বৌ। ফলে তাকে সংসার জীবনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবার মত মানুষের অভাব তো ছিলই। অনেক বয়স পর্যন্ত মাকে দেখেছি নানা বাড়ি ছেড়ে আসার সময় হাপুস নয়নে কাঁদতে। এখন অবশ্য এ কথা বললে স্বীকার করেন না কিন্তু ব্যাপারটা সত্য। তখন বুঝি নাই। এখন বুঝি সে কান্নার অর্থ। 

বাবার সাথে এক সময় বাবার কর্মস্থলে চলে আসলেন তিনি। সাথে আনলেন আমাকে আর আমার ছোট এক চাচাকে। তখন টিভির যুগ আসে নাই। রেডিও ই ভরসা। রেল কলোনীর তিন রুমের বাসা। নড়বড়ে খাট। একটা সোফা। একটা শোকেস আর একটা আলমারী। মেঝেতে পিঁড়ি দিয়ে খাই। বাবা ব্যাগ ভর্তি করে বাজার নিয়ে আসেন। মা কাটেন, কুটেন আর রান্না করেন। আমি তখন সবে নতুন হাঁটতে শিখেছি। সারা বাড়ি দৌড়ে বেড়াই। এটা ওটা ফেলি। নিজে নিজে কথা বলি। তখন রান্না হত হিটারে। একদিন মায়ের কোলে বসে আছি। মা আমাকে কোলে নিয়ে পিঠা ভাজছেন। হিটারের লাল কয়েলের দিকে চোখ যায়। কি মনে করে খুন্তি দিয়ে দিলাম এক খোঁচা। মা একদিকে আর আমি আরেক দিকে ছিটকে পড়ি বিদ্যুৎ এর ধাক্কায়। মার তখন সব মিলিয়ে শাড়ি ছিল বোধ করি চার থেকে পাঁচটি। এই পাঁচ শাড়িতে অনেক বছর চলতে দেখেছি তাকে। অথচ আমার জামা কাপড় গুনে শেষ করা যেত না। সে সময় বাচ্চাদের জন্য ট্রাই সাইকেলের খুব চল হয়েছিল। আজ ভাবলে অবাক লাগে আমার জন্য সে সময় বাবা দু-দুটো ট্রাই সাইকেল কিনে এনেছিলেন । বাবার পোষাকও ছিল সব মিলিয়ে চার থেকে পাঁচটি। ছোট বেলায় অভাব ছিল কিন্তু আমি কখনই বুঝতে পারিনি। যা চেয়েছি তাই পেয়েছি। অন্যের বাড়ির জানালা দিয়ে টিভি দেখতে যেতাম দেখে এক সন্ধ্যেয় বাসায় বাসায় সাদাকালো টিভি আনা হলো। আজও মনে আছে টিভি খোলা মাত্রই দেখি মিকি মাউস চলছে। মায়ের বড় শখের জিনিষ ছিল টিভিটা। ওর জন্য ঘটা করে কাপড়ের নকশী পর্দা বানালেন। যেদিন টিভি আনা হল সেদিন পোলাও মাংস রান্না হল। প্রায় বিশ বছর টিভিটা ছিল উনার সংসারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজও ওটা আছে মনে হয়। তবে গ্রামের বাড়িতে। 

মা খুব গাছ লাগাতে ভালবাসেন। সেই ছোট বেলা থেকেই দেখেছি। আমাদের পাশেই ছিল বিশাল এক নিচু এলাকা । ওর পাশে এক ঝুপড়িতে স্কুলের এক দপ্তরী বা মেথর থাকত। মায়ের লাগানো গাছ, সবজি দেখে এসে প্রায়ই বলত মায়ের হাত বড় পয়মন্ত। আজও মায়ের লাগানো কাঁঠাল গাছ, নারকেল গাছ ওখানে আছে। ফল ধরে। মা রাস্তা দিয়ে গেলে ও গাছের দিকে না তাকিয়ে থাকতে পারেন না। মাঝে মাঝে, ইশ কত বড় হয়ে গেছে ওরা। এরপর বাসা পাল্টে যে বাসায় গিয়েছিলাম আমরা সেখানে এমন কোন সবজি নাই যা আমরা চাষ করি নাই । আলু পর্যন্ত লাগিয়েছি আমরা। সে বাসায়ও রেখে এসেছেন পেয়ারা, আম, কাঁঠাল, তাল, নারকেল, লেবু, নিম, বরই, কামরাঙ্গা, আতা সহ আরও অনেক গাছ। 

আমার মায়ের স্বভাবের সাথে পিঁপড়ের স্বভাবের মিল রয়েছে। পিঁপড়ে যেমন একটু একটু করে জমাতে থাকে, আমরা মাও কোথা থেকে জানি একটু একটু করে জমাতে পারতেন অথচ বাবা কোনদিন মাকে বেতনের টাকা তুলে দিয়েছেন বলে মনে আসে না। আশ্চর্যের ব্যাপার হল পরিবারের সকল সংকটে মায়ের এই জমানো অর্থ সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখত। আজ বুঝি কত হাজারো বাসনা, সাধ, শখ থেকে নিজেকে বন্ঞিত করে এ কাজটা করতেন তিনি কেবল আমাদের কথা ভেবে। সন্তানের কথা ভেবে। আর আমরা তার সেই সব বন্ঞনার কতটুকুই বা নিজেদের কাজ দিয়ে, ভাষা দিয়ে, আবেগ দিয়ে, সেবা দিয়ে পূরন করার চেষ্টা করেছি ? আজ বুঝি না। কোনদিনই চেষ্টা করিনি। আমরা মায়ের ত্যাগ বুঝতে পারব না। পারা সম্ভব না। যদি সম্ভব হত, তবে কোনদিন – কোনদিনই মাকে আমরা এক বিন্দুর জন্য কষ্ট দিতে পারতাম না। অথচ দিব্যি দিয়ে চলেছি আঘাত আর আঘাত। ঈশ্বরের দোজখে কোন মানুষই থাকত না যদি আমরা মায়ের শখ পূরণ করতে পারতাম। 

যে কোন পরিবারের কষ্টগুলো, আরও ভাল করে বললে মায়ের কষ্ট, ত্যাগ আর ভালবাসা সবচেয়ে বেশী বুঝতে পারে ঘরের বড় সন্তানরা। তাই দেখা যায় বড় সন্তানগুলো সবচেয়ে নরম প্রকৃতির হয়। শান্ত হয় এবং ভীতু টাইপের হয়। মা বাবাও সবচেয়ে বেশী আস্থা পান বড় সন্তানে। কারন তাদের জীবনের গোপন, প্রকাশ্য সকল অপরাধ, ভালবাসা, অভিমান, নির্যাতনের জ্বলন্ত স্বাক্ষী এরাই। সে ধারাবাহিকতায় আমিও অনেক কিছুরই স্বাক্ষী। সব কথা বলা যায় না। দেখে যেতে হয়। আমিও দেখে গেছি অনেক কিছু। এ নিয়ে মাঝে মাঝে মাকে প্রশ্নও করেছি। মা এড়িয়ে গেছেন। কখনও একটা র্দীঘশ্বাস ফেলেছেন। কিন্তু মুখ খুলেননি। কেবল একবার বলেছিলেন, সংসারে সব ঠিক হবে তা তো নয়। অনেক ভুল আছে। হবে। এগুলো সহ্য করে যেতে হয়। শেষবেলায় দেখেছি সহ্য করাটা ভুল ছিল না। সহ্য না করলে তোরা এতদূর আসতি না। অবস্থা পাল্টাত না। ধরে রাখতে অনেক কষ্ট করতে হয় রে। 

আমার মা সব কিছুতেই র্ফাস্ট ক্লাশ। নিরপেক্ষ চোখে উনার দোষ-ক্রটি ধরা পড়বে। পড়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একজন সন্তানের কাছে, সন্তানের চোখে উনাদের কোন ভুল হয় না। হওয়া উচিত না। কারন উনাদের ভুল-ভ্রান্তি-দোষ-ক্রটির সবটুকুর সাথেই কোন না কোন ভাবে সন্তানের স্বার্থ, সুখ, আহলাদ জড়িয়ে আছে। 

অনেক বছর আগে যখন কোন ভুল করতাম, কষ্ট পেতাম, কাঁদতাম, ভয় পেতাম, অসুখে পড়তাম তখন দৌড়ে গিয়ে শক্ত করে মাকে জড়িয়ে ধরতাম। মা তার আঁচল দিয়ে সব দুঃখ ভোলাবার চেষ্টা করত। ছোট ভাইটা যখন সিজারিয়ান অপারেশনে জন্ম নিল তখন মায়ের বিছানায় রক্তের দাগ দেখে কেঁদে ফেলেছিলাম। মা নিজের রক্ত না মুছে আমাকে কাছে টেনে কেন কাঁদছি তা জানার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছিলেন। যে বার বাসা থেকে পালিয়েছিলাম, তখন মায়ের উদ্ভ্রান্তের মত ছুটে বেড়ানোর কথা বন্ধুদের মুখে শুনেছি। জেনেছি। যখন আমার জিদ কিছুতেই বাবা মানছিল না তখন এই মা বাবাকে রাজী করাতেন। কেবল আবদার করে গেছি। কষ্ট দিয়ে গেছি। আজও কষ্ট দিয়েই যাচ্ছি। সন্তান, সন্তানরা মায়ের সব আনন্দের যেমন উৎস তেমনি তাঁর সকল কষ্টের উৎসও এই সন্তানরা। 

মাকে যে কষ্টগুলো দিয়েছি তা যখনই মনে আসে তখনই চোখ দিয়ে কেবল পানি ঝরে। আমরা সময়ের কাছে বড় অসহায় কেবল মায়েরা ছাড়া। উনারা সন্তানের জন্য সব কষ্ট সইতে পারেন বলেই সন্তানরা তাদের কষ্ট দিতেই থাকে। মা হারিয়ে যাবার পর আমরা মিলাদ দেই। ফকির খাওয়াই। দোয়া করি। অথচ বেঁচে থাকতে যদি সুখ স্মৃতি নিয়ে উনাদের বিদায় দিতে পারি তাহলে মায়ের সাথের সুখ স্মৃতিগুলো জড়িয়েই আমরা বেঁচে থাকতে পারি। অনুশোচনার চোখের জলে মাকে আমরা খুঁজতাম না তখন। আনন্দ অশ্রুতে মায়ের জন্য প্রার্থনায় মেতে থাকতাম। 

মা, আমি জানি এ লেখা তুমি পড়বে না। কারন তোমার এই সন্তান এ লেখা তোমার হাতে দেবে না। নিরবে রেখে দেবে এক কোনে। নিরবে – নিভৃতে মাঝে মাঝে খুলে দেখবে। কখনও দু-এক লাইন যোগ করবে । কখনও করবে না। কিন্তু মা একটা কথা জেনে রেখ। তোমার এ ছেলে তোমাকে হাজারো কষ্ট দিয়েছে। কিন্তু তারপরও বারবারই সব কষ্টে, দুঃখে, সেই ছোটবেলার মত ছুটে গিয়ে তোমাকে জড়িয়ে ধরতে চায়। বড্ড আশা তার মনে। 

মা কি পারে না সেই ছোট্টবেলার মত মাথায় একটু হাত বুলিয়ে সব যন্ত্রনা দূর করতে? সব কিছু ঠিক করে দিতে ?

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ

Please Select Embedded Mode To show the Comment System.*