আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন কেটেছে ঢাকায়। ২০১৪ - ২০২২ সাল পর্যন্ত আমি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিয়মিত ছিলাম। ২০১৪ সালে আমি প্রথম এবং শেষবারের মতো মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নিয়েছিলাম। শোভাযাত্রা শুরুর কয়েকমুহুর্তে আমার সাধের মোবাইল খানা হারানোর কথা  গত কালই মনে করিয়ে দেয় বন্ধুবর শরিফ খান।





বর্তমান প্রচলিত বাংলা সনের প্রবর্তন সম্রাট আকবরের সময় হতে শুরু হলেও এটি মূলত ৭ম শতাব্দীর হিন্দু রাজা শশাঙ্ককের শক বর্ষপঞ্জির সাথে হিজরি বর্ষপঞ্জির সংমিশ্রণে নতুন একটি বর্ষপঞ্জিকা যা সম্রাট আকবরের আমলে বিভিন্ন অঞ্চলের ভিন্ন ভিন্ন এলাকা থেকে খাজনা আদায় কাজ সহজতর করার জন্য সম্রাটের আদেশে রাজকীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতুল্লাহ শিরাজি চান্দ্র ইসলামি বর্ষপঞ্জি ও সৌর হিন্দু বর্ষপঞ্জিকে একত্রিত করে একটি নতুন বর্ষপঞ্জি তৈরি করেন যা ফসলি সন (ফসলি বর্ষপঞ্জি) নামে পরিচিত ছিল। মোটামুটি এক কথায় এই হল বাংলা নববর্ষের যাত্রার কথা যে যাত্রা শুরু হয় ১৪৭৯ শাকাব্দ, ৯৬৩ হিজরি এবং ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দ থেকে। সেই বছর ১লা মহরম এবং ১লা বৈশাখ একই দিনে ছিলো, সেখান থেকেই যাত্রা শুরু বাংলা সনের। অর্থাৎ বাংলা সনের যাত্রা শুরুই হয় ৯৬৩ বঙ্গাব্দ থেকে। বেশ কিছু ঐতিহাসিক সূত্রমতে এর আগে অগ্রহায়ণ ছিলো তৎকালে প্রচলিত বর্ষপঞ্জিকার প্রথম মাস, কিন্তু ৯৬৩ বঙ্গাব্দ থেকে বৈশাখ মাসকে প্রথম মাস বিবেচনা করা হয়েছে। মজার ব্যাপার বাংলা দিবসের নামগুলো গ্রেগেরিয়ান ক্যালেন্ডার বা ইংরেজি ক্যালেন্ডার এর দিবসের যে ভিত্তি অনুরূপ ভিত্তি থেকে এসেছেঃ রবি (সূর্য), সোম (চাঁদ) মঙ্গল-শনি (গ্রহ)। অপরদিকে মাসের নামগুলো এসেছে শাকাব্দর অনুকরণে জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক প্রাচীন গ্রন্থ "সূর্যসিদ্ধান্ত" অনুসারে নক্ষত্রের নাম থেকেঃ বৈশাখ (বিশাখা), জ্যৈষ্ঠ (জ্যেষ্ঠা), আষাঢ় (আষাঢ়া), শ্রাবণ (শ্রাবণা), ভাদ্র(ভাদ্রপদা), আশ্বিন (আশ্বিনী), কার্তিক (কার্তিকা), অগ্রহায়ণ (অগ্রহায়ণ), পৌষ (পৌষা), মাঘ (মঘা), ফাল্গুন (ফাল্গুনী), চৈত্র (চিত্রা)। ১৭ ফেব্রুয়ারী ১৯৬৬ সালে ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র নেতৃত্বে একটি কমিটি বর্তমানে বাংলাদেশে প্রচলিত বাংলা বর্ষপঞ্জিটি কিছুটা পরিমার্জন এবং পরিবর্ধন করে প্রবর্তিত করেন যা ১৯৮৮ সালের ১৯ জুন বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক সংশোধিত বাংলা সন হিসেবে গৃহীত হয়। সর্বশেষ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সঙ্গে জড়িত ঐতিহাসিক দিবসগুলোকে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের সাথে সমন্বয় করার জন্য ২০২০ সালে বাংলা ক্যালেন্ডার পরিবর্তন করা হয়েছে। তবে - পরিলক্ষিত যে, ভৌগোলিক চাহিদা বিবেচনায় সময়ের আবর্তে সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আসে, হয় সংযোজন-বিয়োজন। যদি ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক পেক্ষাপট চিন্তা করেন, লক্ষ্য করবেন শুধু দুই বাংলায় নয়, দক্ষিণ এবং দক্ষিণ -পূর্ব এশিয়ায় অনেক এলাকায় এপ্রিল মাসে নববর্ষ উদযাপিত হয়। মূলত ফসলের চাষ হতে প্রাপ্ত খাজনা আদায়কে কেন্দ্র করেই এর প্রবর্তন । পুথান্দু (তামিলনাড়ু), ভিক্রাম সামভাট (নেপাল), বোহাং বিহু (আসাম), চৈরুবা (মনিপুর), পি মাই লাও (লাওস), নাবরেহ (কাশ্মির), নজরোজ (আফগানিস্তান) ইত্যাদি অনুষ্ঠান এই অঞ্চলের বর্ষবরণ উৎসব হিসেবে পালিত হয়। তাছাড়া আমাদের আদিবাসী  ভাই-বোনদের বৈসাবি তো আছেই।
১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠির নিপীড়ন ও সাংস্কৃতিক সন্ত্রাসের প্রতিবাদে ১৯৬৭ সাল থেকে ছায়ানটের এই বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা। সামরিক শাসনের অধীনে বসবাসরত হতাশ শিক্ষার্থীরা সম্প্রদায়কে একটি উন্নত ভবিষ্যতের আশা দিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের দ্বারা ১৯৮৯ সাল থেকে শুরু হয় বর্তমানের “মঙ্গল শোভাযাত্রা” যার নাম প্রথমদিকে ছিলো "আনন্দ শোভাযাত্রা"। জাতিসংঘের অঙ্গসংস্থা ইউনেস্কো বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আবেদনক্রমে ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দের ৩০শে নভেম্বর বাংলাদেশের ‘‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’’কে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।

ঢাকায় যে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয় তা সার্বজনীন নয়, বরং বিশেষ একটি ধর্মের প্রাধান্য দেয়া হয় বলে  অভিযোগ করা হচ্ছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো বিশেষ ঐ ধর্মকে প্রাধান্য দিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রায় কারো উপাসনা করার কথা আমাদের জানা আছে কি ? ব্যক্তিগত ভাবে আমার  জানা নাই । একটু খেয়াল করলেই বুঝতে পারবেন, আমাদের দেশের মানুষের মাঝে একটা কমন প্রবনতা আছে। তা হলো আমার যাহা অপছন্দনীয় তা অন্য কেউ পালন করতে পারবে না। আচ্ছা আমার ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ অন্যের উপর চাপিয়ে দেয়া কোন ধরনের স্বাধীনতা! আমার পছন্দ না হলে আমি যাবো না, যার পছন্দ তাকে তো বাঁধা দিতে পারি না।

গ্রামীণ সমাজের কুমোরদের আমাদের  ঐতিহ্যবাহী মাটির তৈরি  তৈজসপত্র , তাল পাখা, বাঁশের বাঁশি বিভিন্ন ধরনের খেলনা, চারুকলার ছাত্র-ছাত্রীদের আঁকা ছবি ইত্যাদি সংযোজন করে এই এই শোভাযাত্রাকে আরো সার্বজনীন রূপ দেয়া সম্ভব বলে মনে করি। আর সাথে পান্তা-ইলিশ ও হালখাতা তো থাকবেই।