লালন ও রবীন্দ্রনাথঃ অদৃশ্য সূতোয় গাঁথা

0
দুই পৃথিবীর দুজন মানুষ। জীবনযাপন থেকে শুরু করে কর্মজীবন, বাল্যকাল থেকে বার্ধক্য আর সাহিত্য থেকে দর্শন সব কিছুতেই দূরত্বের ব্যাপকতা। 
তাহলে কেনো এই দুজন সাহিত্য-সংস্কৃতির দিকপালদের নিয়ে যৌথ আলোচনা ? কেউ যদি ব্যাপারটাকে একই কাপে চা আর কফি মিলিয়ে পরিবেশনার সাথে তুলনা করেন তবে খুব একটা ভুল হবেন না । আমি আসলে লালন এবং রবীন্দ্রনাথ মিলনে অপ্রতিষ্ঠিত যৌগ নিয়েই লিখতে বসেছি।
রহস্যময় এক চরিত্র ছিলেন ব্যাক্তি লালন, কিন্তু মহাত্মা বাউল সম্রাট ফকির লালনকে কিছুটা জানা যায় তার গা গুলোতে। তবে অবশ্যই নিরপেক্ষ ভাবে অনুধাবন করতে হবে। তাঁর মৃত্যুর পনেরো দিন পর কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত হিতকরী পত্রিকার সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলা হয়, “ইহার জীবনী লিখিবার কোন উপকরণ পাওয়া কঠিন। নিজে কিছু বলিতেন না। শিষ্যরা তাহার নিষেধক্রমে বা অজ্ঞতাবশতঃ কিছুই বলিতে পারে না।" তবে অখন্ড বাঙলা’র মানুষের জন্য রাখে গেছে স্বকীয় একচিন্তা ধারা। 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বাংলা সাহিত্যের সকল হেটে বেড়িয়েছেন। পড়েছেন বিলেতে আর বংশমর্যাদায় বঙ্গ অঞ্চলে তাদের ধারে কাছে কম পরিবারই ছিলো। প্রধানত কবি হলেও গদ্য উপন্যাসে জুড়ি মেলা ভার। মানবতার জয়গান করেছেন তার কাব্য-গদ্য-গানে ।
বিশ্বকবি বলে চেনা মানুষটি যে তার জমিদারি এলাকার এবং সামাজিক দৃষ্টিতে সামান্য বাউল দ্বারা প্রভাবিত তা আজ কজন মেনে নেবে? না নিলে ক্ষতি নেই, কারণ স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ মেনে নিয়েছিলেন। বাউল দর্শনে চমকিত হয়ে লিখেছেন-

''কতদিন দেখেছি ওদের সাধককে
একলা প্রভাতের রৌদ্রে সেই পদ্মানদীর ধারে,
যে নদীর নেই কোনো দ্বিধা, পাকা দেইলের পুরাতন ভিত ভেঙে ফেলতে।
দেখেছি একতারা-হাতে চলেছে গানের ধারা বেয়ে
মনের মানুষকে সন্ধান করবার গভীর নির্জন পথে।''

অথচ এই ফকির লালনের গান অথবা নাম শুনেই নাক ছিটকানোর মানুষ এদেশে নেহাৎ কম নেই।
মজার ব্যাপার হলো আমাদের প্রিয় জাতীয় সংগীতের সুর রবীন্দ্রনাথ করেন নি কিংবা বলা যায় করেছেন অন্যকোন সুরের ছায়ায়। চমকাবেন না! যারা আগে জানতেন না তারা শুনেন যে রবিন্দ্রনাথ নিজে কি বলে?
রবীন্দ্রনাথের ভাষায় – 

“আমার লেখা যারা পড়েছেন, তাঁরা জানেন বাউল পদাবলীর প্রতি আমার অনুরাগ আমি অনেক লেখায় প্রকাশ করেছি। শিলাইদহে যখন ছিলাম, বাউল দলের সঙ্গে আমার সর্বদাই দেখা সাক্ষাৎ ও আলাপ- আলোচনা হতো। আমার অনেক গানে আমি বহু সুর গ্রহন করেছি এবং অনেক গানে অন্য রাগরাগিনীর সাথে আমার জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে বাউল সুরের মিল ঘটেছে। এর থেকে বোঝা যাবে, বাউলের সুর ও বানী কোন এক সময় আমার মনের মধ্যে সহজ হয়ে মিশে গেছে। আমার মনে আছে, তখন আমার নবীন বয়স- শিলাইদহ অঞ্চলের এক বাউল একতারা হাতে বাজিয়ে গেয়েছিল -

‘কোথায় পাবো তাঁরে - আমার মনের মানুষ যেঁরে।
হারায়ে সেই মানুষে- তাঁর উদ্দেশে
দেশ বিদেশে বেড়াই ঘুরে ।’


ঐ বাউলের গানের কথা ও সুরের মাধুর্য আমাকে এতোই বিমোহিত করেছিলো যে, আমি সেই সুর ও ছন্দে বাংলাদেশকে মাতৃরূপ জ্ঞানে লিখেছি -

আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি,
চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস
আমার প্রাণে বাঁজায় বাঁশি ।’’


প্রথম গানটি বেধেছিলেন ফকির লালন সাইজির ভাব শিষ্য গগন হরকরা।

হ্যা, কবিগুরু নিজেও প্রভাবিত হয়েছিলেন বাউল দর্শনে, ভালোবেসেছিলেন। তিনি হয়ত বুঝতে পেরেছিলেন শত বছর পরেও লালনের গান সামাজিক প্রেক্ষাপটে সত্য হয়ে থাকবে। কিন্তু না জেনেই যখন মানুষ অথবা কিছু বিশেষ অজ্ঞ মানুষ লালনের যখন ধর্ম আর দর্শন নিয়ে মুখ বাকিয়ে প্রশ্ন তোলে তখন সত্যি খুব ছোট মনে হয় নিজেকে। লজ্জা হয় নিজেকে জানতে না পারার জন্য। 

ফকির লালন গেয়েছিলেন, 
“কেন খুঁজিস মনের মানুষ বনে সদাই।
এবার নিজ আত্ম রূপ যে আছে দেখো সেই রূপ দীন দয়াময়। 
কারে বলি জীবাত্মা কারে বলি স্বয়ং কর্তা ।
আবার দেখি ছটা চোখে ভেল্কি লেগে মানুষ হারায়।।’’

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ

Please Select Embedded Mode To show the Comment System.*