বেগম রোকেয়া : নারীবাদী নন, নারীমুক্তির পথিকৃৎ
মোতাহার হোসেন সুফী : বাংলার মুসলিম নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া। তিনি নারীবাদী নন নারীমুক্তির পথিকৃৎ। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে ১৮৮০ সালে রংপুর জেলার পায়রাবন্দের জমিদার পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বরে অবিভক্ত বাংলার রাজধানী কলকাতায় পরলোকগমন করেন। ইংরেজ শাসকের ‘বিভেদ করে শাসন কর’ নীতি অনুসরণের দরুন এবং ইংরেজী শিক্ষাবিরোধী মনোভাবের কারণে ভারতবর্ষের মুসলমান সম্প্রদায় ছিল হতদরিদ্র, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে অনগ্রসর। এই পরিবেশে ইংরেজ আমলের বাংলাদেশে আবির্ভাব ঘটে বেগম রোকেয়ার। শিক্ষা–দীক্ষায় অনগ্রসর পশ্চাৎপদ মুসলমান সম্প্রদায়ের নারী সমাজের অবস্থা ছিল অধিকতর শোচনীয়। মুসলমান সমাজে প্রচলিত নানাবিধ সামাজিক কুসংস্কার,পর্দা প্রথার নামে অমানবিক কঠোর অবরোধ প্রথা ও স্ত্রী শিক্ষাবিরোধী অনুদার মনোভাবের কারণে মুসলমান নারীরা ছিল সর্বাধিক পশ্চাৎপদ। মুসলমান নারীদের পশ্চাৎপদতা ও দুরবস্থা দয়ার্দ্র বেগম রোকেয়ার অন্তরকে পীড়িত করেছে, হৃদয়কে করেছে ব্যথিত ।

মুসলমান সম্প্রদায়ের সার্বিক উন্নতির লক্ষ্যে বিশেষত মুসলমান নারীদের মুক্তি বেগম রোকেয়ার জীবনব্রত, স্বপ্ন ও সাধনা। মানবসভ্যতার বিকাশ ও উৎকর্ষ এবং সার্বিক কল্যাণ সাধনের জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন নারী ও পুরুষের মধ্যে শিক্ষার বিস্তার। নারী মুক্তি অর্জনের লক্ষ্যে তিনি নারীদের মধ্যে সর্বপ্রথম শিক্ষার প্রচার ও প্রসারের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। যুগ যুগ ধরে মুসলমান সমাজে কুসংস্কার, কূপমন্ডূকতা ও অবনতির কারণসমূহ পুঞ্জীভূত হয়ে প্রগতির পথ রুদ্ধ করেছিল, তা একমাত্র শিক্ষা প্রচারের দ্বারাই দূর করা যেতে পারে–একথা তার কাছে ছিল নিঃশ্বাস–প্রশ্বাসের মতোই সত্য। অন্তর দিয়ে এই সত্য তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। বেগম রোকেয়া তাঁর সমগ্র জীবনের অভিজ্ঞতায় এই সত্যও উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, শিক্ষা জাতির মেরুদ– এবং শিক্ষা ছাড়া জাতির উন্নতি কোনক্রমেই সম্ভবপর নয়। দেশের বিপুল জনসমষ্টির অর্ধেক নারী। এই বিপুল জনসমষ্টিকে অশিক্ষা ও অজ্ঞানতার অন্ধকারে রেখে জাতির উন্নতি সাধন অলীক কল্পনা মাত্র। সমাজের উন্নতি সাধনের জন্য শুধু পুরুষ সম্প্রদায় নয়, নারী সম্প্রদায়েরও উন্নতি সাধন প্রয়োজন। একই সমাজদেহের দুই অপরিহার্য অঙ্গ – নারী ও পুরুষ। পুরুষের বিকাশ যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন নারীরও বিকাশ। তিনি এই সত্য অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলেন বলেই সমাজের সার্বিক কল্যাণের স্বার্থে শিক্ষা প্রচারের মাধ্যমে নারীসমাজের সার্বিক উন্নতি ও কল্যাণ সাধনের জন্য স্বীয় জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। জাতীয় জাগরণের ক্ষেত্রে স্যার সৈয়দ আহমদের চিন্তা–ভাবনার সঙ্গে মহীয়সী বেগম রোকেয়ার চিন্তা–ভাবনার সামঞ্জস্য দেখা যায়। স্বাধীনতাহীন ভারতবর্ষের মুসলমান সম্প্রদায় ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসনামলে শিক্ষাদীক্ষায় বঞ্চিত হয়ে অধঃপতিত হয়েছিল। স্বজাতির অধঃপতিত অবস্থা স্যার সৈয়দ আহমদকে বিচলিত ও মর্মাহত করে। শিক্ষার মাধ্যমেই জাতীয় জাগরণ সম্ভব এই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি শিক্ষা প্রচার আন্দোলনে ব্রতী হয়েছিলেন। তাঁর এই শিক্ষা প্রচার আন্দোলন ‘আলীগড় আন্দোলন’ নামে পরিচিত। অনুরূপভাবে বেগম রোকেয়াও বাংলার মুসলমান নারী সম্প্রদায়ের দুর্দশা ও অধঃপতিত অবস্থা দেখে হয়েছিলেন মর্মাহত ও ব্যথিত । দেশ ও জাতির স্বার্থে মুসলমান নারী সমাজের জাগরণের জন্য তিনি শিক্ষার প্রচার আন্দোলনে ব্রতী হয়েছিলেন। ১৯০৯ সালের ৩ মে তারিখে স্বামী খানবাহাদুর সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন মাত্র ৫১ বছর বয়সে অকালে পরলোকগমন করেন। স্বামীর অকাল মৃত্যুতে স্বামী সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হওয়ার পর প্রয়াত স্বামীর স্মৃতির প্রতি যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শনের জন্য ও সেই সঙ্গে শিক্ষার প্রচার ও প্রসারের আকাঙ্খায় তিনি প্রথমে ভাগলপুরে মুসলিম বালিকাদের জন্য একটি স্কুল স্থাপন করেন। এই স্কুলটি স্থাপিত হয় তাঁর স্বামীর ইন্তেকালের প্রায় ৫ মাস পরে ১৯০৯ সালের ১ অক্টোবরে। সে সময়ে স্কুলটির ছাত্রী সংখ্যা ছিল নিতান্তই কম। মৃত্যুর পূর্বে সাখাওয়াত হোসেন মুসলিম মেয়েদের শিক্ষার উন্নতি বিধানের জন্য স্ত্রী রোকেয়াকে ১০ (দশ) হাজার টাকা দান করেন এবং তাঁকেই তিনি ট্রাস্টি মনোনীত করেন। এই বিপুল পরিমাণ টাকার জন্য বেগম রোকেয়া তাঁর সতীনকন্যা ও জামাতার প্রবল বিরোধিতার সম্মুখীন হন। তাদের দুর্ব্যবহারে অতিষ্ঠ হয়ে ১৯১০ সালের শেষ ভাগে ভাগলপুরের স্বামীগৃহ ত্যাগ করে কলকাতায় চলে আসতে বাধ্য হন। বস্তুত কলকাতায় আগমন তাঁর জীবনের পক্ষে শুভই হয়েছিল। এখানেই তাঁর সুপ্ত প্রতিভা পরিপূর্ণভাবে বিকাশ লাভ করার সুযোগ পায়। কলকাতায় চলে আসার পর তিনি ১৯১১ সালের ১৬ মার্চ তারিখে নতুন উদ্যমে স্বল্পসংখ্যক ছাত্রী নিয়ে ১৩ নম্বর ওয়ালিউল্লাহ লেনের একটি বাড়িতে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুলের ক্লাস শুরু করেন। ১৩ নম্বর ওয়ালিউল্লাহ লেনের বাড়িতে স্থান সংকুলান না হওয়ায় ১৯১৩ সালের ৯ মে তারিখে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল ১৩ নম্বর ইউরোপীয়ান এসাইলাম লেনে সরানো হয়। ১৯১৫ সালের সূচনায় স্কুলটি উচ্চ প্রাইমারি বিদ্যালয়ে পরিণত হয় এবং বছরের শেষে ছাত্রী সংখ্যা ৮৪–তে দাঁড়ায়। ছাত্রী সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকায় ১৯১৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি এই স্কুল ৮৬/এ লোয়ার সার্কুলার ঠিকানায় স্থানান্তরিত হয়। সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুলকে গড়ে তোলার জন্য বেগম রোকেয়াকে হাড়ভাঙ্গা কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে।
ব্রিটিশ ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিশিষ্ট নেত্রী সরোজিনী নাইডু সুদূর হায়দারাবাদ থেকে ১৯১৬ সালে ১৬ সেপ্টেম্বর লিখিত এক চিঠিতে শিক্ষা বিস্তারে বেগম রোকেয়ার মহৎ প্রচেষ্টার সাফল্য কামনা করে মন্তব্য করেছেন, “… কয়েক বৎসর হইতে দেখিতেছি, আপনি কি দুঃসাহসের কাজ করিয়া চলিয়াছেন। মুসলমান বালিকাদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের জন্য আপনি যে কাজ হাতে নিয়াছেন এবং তাহার সাফল্যের জন্য দীর্ঘকালব্যাপী যে ত্যাগ সাধনা করিয়া আসিতেছেন, তাহা বাস্তবিকই বিস্ময়কর। আপনার প্রতি আমার আন্তরিক সহানুভূতি এবং শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করিবার উদ্দেশ্যেই এই চিঠিখানা লিখিলাম।
… আজ সাময়িকপত্রে আপনার স্কুলের বার্ষিক রিপোর্ট পড়িতেছিলাম। আপনার এই ভগ্নী দূর হইতে বরাবর আপনার আদর্শকে এবং আপনার কর্মময় জীবনকে কিরূপ শ্রদ্ধার চোখে দেখিয়া থাকে, তাহা জানাইবার জন্যই এই চিঠি। মুসলমান নারীদের কল্যাণের জন্য আপনি যে অক্লান্ত সাধনা করিতেছেন, বিধাতা করুন, তাহা জয়যুক্ত হউক।” স্কুলের বিরুদ্ধে বিরোধিতা ও নানা ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও বেগম রোকেয়ার অসীম অধ্যবসায় ও আন্তরিক অনুপ্রেরণার ফলস্বরূপ ১৯৩০ সালে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয়ে পরিণত হয়।
ইংরেজ ঔপনিবেশিক আমলে মুসলিম নারী সমাজের মধ্যে রেনেসাঁ তথা পুনর্জাগরণের বাণী বহন করে এনেছেন বেগম রোকেয়া। মুসলিম নারী সমাজ স্বাবলম্বী হোক, শিক্ষাদীক্ষায় জ্ঞানেকর্মে পুরুষদের মতোই যোগ্যতা অর্জন করুক, সামাজিক কর্মকান্ডে পুরুষদের মতো নারী সমাজও অবদান রাখতে সক্ষম হোক এটাই ছিল তার আন্তরিক কামনা। মুসলমান নারী সমাজের মধ্যে যুগ যুগ ধরে যে সমস্ত কুপ্রথা ও কুসংস্কার প্রচলিত আছে, যে সমস্ত কূপমন্ডূকতা আছে সেগুলো দূরীভূত করে মুসলমান নারী সমাজের সর্বাঙ্গীন কল্যাণ ও মঙ্গল সাধনের মহতী উদ্দেশ্যে ১৯১৬ সালে বেগম রোকেয়ার প্রচেষ্টায় স্থাপিত হয় ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলাম’ বা মুসলিম মহিলা সমিতি। জাতি গঠনমূলক কাজের জন্য আঞ্জুমানের নাম ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। বেগম রোকেয়া ১৯২০ সালে কলকাতার স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রদর্শনীর সভানেত্রী, ১৯২৫ সালে আলীগড় মহিলা সমিতির সম্মেলন এবং ১৯২৬ সালে বেঙ্গল উইমেন্স এডুকেশনাল কনফারেনস–এর সভানেত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

নারী মুক্তির দর্শন হিসেবে সর্বাধিক আলোচিত বিষয় নারীবাদ। এই মতবাদের উদ্ভব পাশ্চাত্যে। প্রথমে পাশ্চাত্যের মতবাদ হিসেবে গণ্য হলেও বর্তমানে তা প্রাচ্য এমনকি প্রাচ্যের এক নিভৃত ভূখন্ডে বাংলাদেশেও নারীবাদ আলোচিত একটি বিষয়। সম্ভবত এই মতবাদ সম্পর্কে প্রথম আলোকপাত করেছেন গবেষক হুমায়ুন আজাদ। নারীবাদ ও নারী সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাঁর লেখা গ্রন্থটিরও নাম ‘নারী’। এই গ্রন্থে গবেষক নারীবাদের পথিকৃৎ মেরি ওলস্টোন ক্র্যাফটের জীবনের প্রাসঙ্গিক বিবরণ, তার সংগ্রাম ও সে সম্পর্কে লেখা গ্রন্থাদির পরিচয় দিয়েছেন। একই সঙ্গে নারীবাদের উদ্ভব, নারীবাদের স্বরূপ,নারীবাদের পথিকৃৎ মেরি ওলস্টোন ক্র্যাফটের[১৭৫৯–১৭৯৯] চিন্তাধারা এবং নারীবাদের প্রেক্ষাপটে পুরুষতন্ত্র ও রোকেয়ার নারীবাদ সম্পর্কেও আলোচনা করেছেন। পাশ্চাত্যের নারীবাদের পুরোধা মেরি ওলস্টোন ক্র্যাফটের লেখা বইটির পুরো নাম ‘এ ভিন্ডিকেশন অফ দি রাইটস অফ ওম্যান : উইথ স্ট্রিকচারস অব পোলিটিক্যাল এ্যান্ড মোরাল সাবজেক্টস। সংক্ষেপে ‘ভিন্ডিকেশন’। মেরি দুই সপ্তাহে লেখেন তেরো পরিচ্ছেদের এই বইটি। ১৭৭২ সালে এই বইটি প্রকাশ করেন জোসেফ জনসন। হুমায়ুন আজাদের মতে, মেরির বইটি অকাট্য নীতি – প্রণালীভিত্তিক নারীমুক্তির প্রথম সুপরিকল্পিত প্রস্তাব, ইশতেহার, ঘোষণা ও নারীবাদের আদি গ্রন্থ। নারীবাদের সমর্থক ‘নারী’ গ্রন্থ প্রণেতা হুমায়ুন আজাদ নারীবাদী হিসেবে রোকেয়ার ভাবমূর্তি তুলে ধরার প্রয়াসে মন্তব্য করেছেন মেরি ওলস্টোন ক্র্যাফট অপেক্ষা কট্টর নারীবাদী ছিলেন রোকেয়া। নারীবাদী নেত্রী মেরি ওলস্টোন ক্র্যাফট নারী মুক্তির সমস্যার শেকড়ে প্রবেশ করতে সক্ষম হননি। তার নারীবাদের মূলমন্ত্র ‘পুরুবিদ্বেষ’ ‘পুরুষদ্রোহিতা’ ও ‘ঈশ্বরদ্রোহিতা’। নারীমুক্তির অন্তরায় হিসেবে তিনি চিহ্নিত করেছেন দুই প্রতিপক্ষ – ঈশ্বরকে ও পুরুষকে। নারীবাদের মহাদর্শে নারীর ভুবনে অস্তিত্ব নেই ঈশ্বর ও পুরুষের।
বেগম রোকেয়া মুসলমান নারীসমাজের অবনতির কারণসমূহের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে বলেছেন, অবনতি রোধ করে সমাজে যথাযোগ্য ভূমিকা গ্রহণের জন্য নারীকে স্বীয়শক্তি সম্পর্কে সচেতন হতে হবে,আত্মনির্ভরশীল হতে হবে। সমাজের সার্বিক উন্নতির জন্য পুরুষের পাশাপাশি নারীকেও যথাযোগ্য ভূমিকা গ্রহণের যোগ্যতা অর্জনের জন্য হতে হবে সচেষ্ট।
‘সুগৃহিণী’ প্রবন্ধে বেগম রোকেয়া দৃঢ়ভাবে বলেছেন, নর ও নারীর সমন্বয়ে মানবসমাজ। নর ও নারীর পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল উভয়ের মধ্যকার সুস্থ সম্পর্ক; এবং নর ও নারীর সমন্বয়ে গঠিত সমাজের সুস্থতা। সমাজ ও পৃথিবীকে বাসযোগ্য করা নর ও নারীর উভয়ের সমাজ কর্তব্য। সমাজে অধঃপতিত অবস্থার কারণ নির্ণয় প্রসঙ্গে অধিকাংশ প্রবন্ধে শিক্ষা অর্জনে নারীর পশ্চাৎপদতা, শিক্ষাহীনতা ও সুশিক্ষার অভাবের কথা বলেছেন বেগম রোকেয়া। তিনি বলেছেন, ‘… প্রকৃত সুশিক্ষা চাই– যাহাতে মস্তিষ্ক, মন উন্নত হয়। আমরা উচ্চশিক্ষাপ্রাপ্ত না হইলে সমাজও উন্নত হইবে না। যতদিন আমরা আধ্যাত্মিক জগতে পুরুষদের সমকক্ষ না হই,ততদিন পর্যন্ত উন্নতির আশা দুরাশা মাত্র। আমাদিগকে সকল প্রকার জ্ঞানচর্চা করিতে হইবে। শিক্ষার অভাবে আমরা স্বাধীনতা লাভের অনুপযুক্ত হইয়াছি অযোগ্য হইয়াছি বলিয়া স্বাধীনতা হারাইয়াছি। অদূরদর্শী পুরুষেরা ক্ষুদ্র স্বার্থ রক্ষার জন্য এতদিন আমাদিগকে শিক্ষা হইতে বঞ্চিত রাখিতেন।
এখন দূরদর্শী ভ্রাতাগণ বুঝিতে পারিয়াছেন যে,ইহাতে তাঁহাদের ক্ষতি ও অবনতি হইতেছে। তাই তাঁহারা জাগিয়া উঠিতে ও উঠাইতে ব্যস্ত হইয়াছেন। আমি ইতোপূর্বেও বলিয়াছি যে, নর ও নারী উভয়ে মিলিয়া একই বস্তু হয়। তাই একটিকে ছাড়িয়া অপরটি সম্পূর্ণ উন্নতি লাভ করিতে পারিবে না। এখনও তাহাই বলি এবং আবশ্যক হইলে ঐ কথা শতবার বলিব।’ হুমায়ুন আজাদ বলেছেন, রোকেয়া পুরুষ বিদ্বেষী। সমাজের সার্বিক উন্নতি অর্জনে বেগম রোকেয়া যে পথনির্দেশ দান করেছেন তাতে পুরুষের প্রতি কোন বিদ্বেষ আছে কি?
মুসলমান নারীসমাজের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের অবসান ঘটাতে ইসলামের আদর্শ অনুসরণের দৃশ্য বেগম রোকেয়া উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। খ্রিস্টধর্ম বা অনুরূপ কোন ভাবধারার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তিনি মুসলমান নারীসমাজের দুর্গতি মোচনে ব্রতী হননি। ইসলামে নারীর প্রতি সুবিচার করার দৃশ্য নির্দেশ দান করা হয়েছে। মহানবী হজরত মুহম্মদ (সাঃ)আরবের নারীসমাজকে সকল প্রকার শোষণ ও নির্যাতন থেকে মুক্তি দান করে অনন্য সাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। রসুলুল্লাহর (সাঃ) দৃষ্টান্ত তুলে ধরে মুসলমান পুরুষ সম্প্রদায়কে তা অনুসরণের জন্য তাগিদ দিয়েছেন বেগম রোকেয়া। পুরুষদের প্রতি বিদ্রোহ ও ঘৃণা প্রকাশ তিনি করেননি। নারীবাদীদের মতো বেগম রোকেয়াকে পুরুষবিদ্বেষী ও ধর্মদ্রোহী বলা যায় কি? বেগম রোকেয়া ছিলেন ধর্মপরায়ণ। আল্লাহর প্রতি সুগভীর বিশ্বাস তাঁর সমগ্রজীবনে সাহস ও প্রেরণা জুগিয়েছিল। প্রতিদিন ভোরে পবিত্র কোরআন শরীফ পাঠে তিনি অনাবিল আনন্দ লাভ করতেন। অথচ নারীবাদের সমর্থক ‘নারী’ গ্রন্থপ্রণেতা হুমায়ুন আজাদ ধর্মদ্রোহী হিসেবে রোকেয়াকে চিত্রিত করেছেন।
বেগম রোকেয়ার চিন্তাধারার উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য, তাঁর সৃষ্ট সাহিত্যসম্ভারে পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নয় বলা সঙ্গত, ক্ষোভ এবং তাতে নেই ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ। নারীমুক্তি সম্পর্কিত রচনাবলীর কোথাও তিনি অস্বীকার করেননি ধর্মকে। তাঁর নিজের কথা, ‘কোন বিশেষ ধর্মের নিগূঢ় মর্ম বা আধ্যাত্মিক বিষয় আমার আলোচ্য নহে। ধর্মে যে সামাজিক আইনকানুন আছে, আমি কেবল তাহারই আলোচনা করিব, সুতরাং ধার্মিকগণ নিশ্চিন্ত থাকুন।’ তিনি ধর্মের মূলমন্ত্রকে গ্রহণ করে খোলশকে বর্জন করার তাগিদ দিয়েছেন। বেগম রোকেয়া ছিলেন ধর্মনিষ্ঠ। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজ ধর্মের প্রতি ছিলেন তিনি অনুগত।
‘পদ্মরাগ’ উপন্যাসের নিবেদন অংশে ধর্ম সম্পর্কে বেগম রোকেয়া যুক্তিনিষ্ঠ আলোচনা করেছেন। এতে আল্লাহ সম্পর্কে রোকেয়ার অন্তরের উপলব্ধির পরিচয় লাভ করে কোন পাঠকের কি মনে হবে তিনি ধর্মদ্রোহী ছিলেন?নারীবাদে পুরুষতন্ত্র যেমন আক্রমণের বস্তু তেমনি আক্রমণের বস্তু ঈশ্বর। ‘নারী’ গ্রন্থের লেখক হুমায়ুন আজাদের বক্তব্য, ‘মেরি ওলস্টোন ক্র্যাফট অপেক্ষা বেগম রোকেয়া কট্টর নারীবাদী। মেরির ন্যায় রোকেয়ার কাছেও পুরুষতন্ত্র ও ঈশ্বর ছিল আক্রমণের বস্তু।’ বেগম রোকেয়া সম্পর্কে এই অভিযোগ যুক্তিহীন ও অসত্য। বেগম রোকেয়া ছিলেন সমাজ সচেতন। তার মতে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষের কর্তৃত্ব দৃঢ় বলে ধর্মের দোহাই দিয়ে পুরুষ প্রভুত্ব বিস্তার করে নারীর ওপর। ধর্মগ্রন্থে নারীকে যে মর্যাদা ও অধিকার দান করা হয়েছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে তার বাস্তবায়ন দুরূহ। ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে ন্যায্য অধিকার থেকে নারীকে বঞ্চিত করা হয়। নারীর অধিকার সংরক্ষণ ও প্রতিষ্ঠায় ধর্মের অপব্যাখ্যাও ও ধর্মের বাড়াবাড়িকে অন্তর থেকে ঘৃণা করেছেন বেগম রোকেয়া। আবার নিজের ধর্ম তো নয়ই অন্য কোন ধর্মের প্রতি ছিল না তার কোন বিদ্বেষ। তাই যৌক্তিক নয়,তাঁকে ধর্মদ্রোহী অভিধা প্রদান।
পুরুষতন্ত্রে শুধু নারী কেন, পুরুষ কি পুরোপুরি স্বাধীন? প্রচলিত সমাজে সনাতনী ধ্যানধারণা,জীবনাচরণ, অশিক্ষা ও অসচেতনতার কারণে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত নারীসমাজ। সমস্যা নারীর মুক্তি নিয়ে যেমন তেমনি প্রয়োজন পুরুষেরও। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষ ও নারী উভয়েই পরাধীন। প্রচলিত সমাজের বিধি ব্যবস্থার পরিবর্তন, সমাজে নারী ও পুরুষের সমান মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য নারী ও পুরুষের সম্মিলিত সংগ্রামের তাগিদ তাঁর রচনাবলীতে দিয়েছেন বেগম রোকেয়া। নারী মুক্তির জন্য ধর্ম ও সমাজবন্ধনকে অস্বীকার করে নারীবাদীদের মতো নারীকে ভোগের বস্তু কিংবা প্রদর্শনীর সামগ্রীতে পরিণত করতে চাননি বেগম রোকেয়া। তাঁকে পুরুষতন্ত্রের ও পুরুষ প্রচারিত ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী আখ্যা দিয়ে তাঁর ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠার যে অপপ্রয়াস চালানো হয় তা যেমন যুক্তিযুক্ত নয়, তেমনি গ্রহণযোগ্যও নয়। এ কথা বলা তাই যুক্তিসঙ্গত যে, বেগম রোকেয়া নারীবাদী নন তিনি নারীমুক্তির পথিকৃৎ।

