বুক রিভিউ
খন্ড জীবন, খন্ড রাজনীতি, খন্ড দেশ ও খন্ড আত্মজীবনী (১৯২০-১৯৫৫) । ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতির রুপায়নের অখন্ড দলিল এ অসমাপ্ত আত্মজীবনী। একজন মানুষের রাজনৈতিক জীবনের স্রোতের গভীরে যে একটি ভুখন্ডের রাজনীতির মূল সন্ধান আমরা পেতে পারি তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’। তাই একে নিছক মুজিবের আত্মজীবনী বলার চেয়ে আমি অখন্ড বাংলা ও স্বাধীন বাংলাদেশের ভিত রচনার দলিল বলার পক্ষপাতী।
দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড থেকে ২০১২ সালের জুনে বের হওয়া এ দলিলের পেছনে রয়েছে ২৯ বছরের পেছনের গল্প। ১৯৬৭ সালে জেলে বসে মুজিবের লিখা চারটি খাতা ২০০৪ সালে হাতে পায় বঙ্গকন্যা। সে সময়কার ইতিহাস বিশ্ববাসীকে জানানোর অনুভূতি বাস্তব রুপ পায় ২০১২ সালে।
এ গ্রন্থে স্থান পায় জাতির পিতার শৈশব, কৌশর, শিক্ষাজীবন, নিজ গ্রাম আর দেশবাসীকে ভালবাসার উজ্জ্বল লুব্ধক। দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা, দেশভাগ, পূ্র্ব বাংলার রাজনীতি, ভাষা আন্দোলন মূল উপজীব্য । শেষ কলেবরে রয়েছে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন ও রাজনীতি। ৭টি ভাষায় অনূদিত এ বইটির ভূমিকা লেখেন শেখের বেটি শেখ হাসিনা। কি অসাধরণ মিল বাপ বেটির! কারাবন্ধী অবস্থায় আত্মজীবনী লিখেন পিতা, আর সেই আত্মজীবনীর ভূমিকাও লিখেন হাসু জেল বসেই।
বইটির শুরুতে আছে তাঁর আত্ম পরিচয় , বংশপরিচয় । বইটি লিখার ক্ষেত্রে বঙ্গমাতা রেণু ও তাঁর সহকর্মীরা যে তাকে উদ্দীপ্ত করেছিলো তা স্পষ্ট। শৈশবে শহীদ সাহেবের সাথে তার যে সখ্যতা সেটিও ফুঁটে উঠে বইটির আদ্যোপান্তে।
মুজিব দেশের মানুষকে কতটুকুন ভালবাসতো তার ছাপ আমরা দেখতে পাই তাঁর শৈশবেই। মুষ্টির ভিক্ষার চাল উঠিয়ে সাহয্য করতেন গরীব শিক্ষার্থীদের। যারা ভালো খেলতো তাদের পড়াশুনার বেতন ফ্রি করে দিতেন।
সময় গড়িয়ে যায়। সময়ের সাথে নিজেকে ঝলিয়ে নিতে ভুলতেন না তিনি। নিয়মিত পত্রিকা পড়তেন। ছিলেন রাজনৈতিক সচেতন। ভর্তি হলেন ইসলামিয়া কলেজে। বেকার হোস্টেল হয়ে উঠল তার রাজনীতির আতুড়ঘর। জড়িয়ে পড়লেন রাজনীতিতে। তবু আস্থা হাড়ায় নি মুজিব পিতা শেখ লুৎফর রহমান বরং দৃঢ় কন্ঠে বললেন,‘‘বাবা রাজনীতি কর আপত্তি করব না, পাকিস্থানের জন্য সংগ্রাম করছ এ তো সুখের কথা, তবে লেখাপড়া করতে ভুলিও না। ’’
বাবার সাথে দেখা হলেই চলে রাজনৈতিক কথোপকথন। এবার প্রেক্ষাপট দেশভাগ। লক্ষ্য বৃটিশদের শিকড় থেকে মুক্তি। সে সময় মুজিব পুরোপুরি সান্নিধ্যে চলে আসেন অবিভক্ত বাংলার অবিসংবাদিত নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর । তবে বাবার বলা সিনসিয়ারিটি অব পার্পাস ও সিনসিয়ারিটি অব অনেস্টি প্রশ্নে নিজের নেতার সাথেও কোনদিন আপোষ করেন নি। বইটির ২৯ পৃষ্টায় একটি খন্ড বাক্যে তা সুস্পষ্ট হয়ে উঠে।
‘‘শহীদ সাহেবের সাথে আমার কথা কাটাঁকাটিঁ হয়। তিনি আনোয়ার সাহেবকে একটা পদ দিতে বলেন, আমি বললাম তা কখনোই হতে পারে না। সে প্রতিষ্ঠানে কোটারি করেছে, ভাল কর্মীদের জায়গা দেয় না । শহীদ সাহেব বললেন, ``who are you? You are nobody’’
মুজিব বলেন-
``If I am nobody, then why you have invited me? You have no right to insult me. I will prove that I am somebody. Thank you sir. I will never come to you again.
পরে শহীদ সাহেব পরে তাকে ডেকে সব বুঝিয়ে বললেন এবং মুজিবের রাগ কমলো। সামনে মুসলিম লীগ নির্বাচন। শহীদ সাহেবের অন্যতাম অনুপ্রেরণা ও মন্ত্রক মুজিব। জয় পেলেন শহীদ সাহেব।
এত ভলোবাসার ভিড়েও বাঙ্গলিদের কিছু খাপছাড়া বিষয় তাকে হতাশ করতো। তাঁর সহজ স্বীকারোক্তির মধ্যে সে বিষয়ে আমরা ধারণা পাই
‘‘আমাদের বাঙ্গালির মধ্যে দুইটা দিক আছে। একটা হল ‘আমরা মুসলমান, আর একটা হল, আমরা বাঙ্গালি।’ পরশ্রীকাতরতা এবং বিশ্বাসঘাতকতা আমাদের রক্তের মধ্যে রয়েছে।
হয়তো মুজিব ১৯৭৫ সালে নিজের এ কথার মর্মার্থ বুঝেছিলেন আরো একবার।
ইতোমধ্যে দেশভাগ হলো, হলো পার্টিশান ও দাঙ্গা। শুরু হলো পাকিস্তানের ষড়যন্ত্রের রাজনীতি। বাংলা ভাষার প্রশ্নে পাক ভূমি নাপাকা হতে শুরু করলো। একদল লোভী বাঙ্গালী বাংলার বিরোধিতা করলো। শুধু ভাষার প্রশ্নেই স্পষ্ট হয়ে উঠলো দুই পাকিস্থানের ভেদাভেদ। জিন্নার উর্দূ প্রীতির প্রতিবাদ করলো বাংলার ছাত্র সমাজ। রোজ গার্ডেনে গড়ে উঠলো পূর্ব পাকিস্থান আওয়ামী মুসলিম লীগ , পরে সময়ের প্রেক্ষাপটে আওয়ামী মুসলিম লীগ অবশেষে আওয়ামী লীগ। শুরু হলো পশ্চিম পাকিস্থানের ষড়যন্ত্রের দূর্বার প্রতিবাদ।
লিয়াকত আলী খান ঘোষণা দিলেন, ‘ যো আওয়ামী লীগ করেগা, উসকো শের হাম কুচাল দেগা।’ মুজিব প্রতিবাদ করলো। তারপর জেল, সেল। ‘জেলের মধ্যে জেল তাকেই বলে সেল।’
জেলে বসেই ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত রুপরেখা প্রস্তুত করেন তিনি । দায়িত্ব দেন অলি আহাদকে। আন্দোলন চলেতে থাকে।
জীবনের বেশির ভাগ সময় থাকতে হয়েছে তাঁকে জেলে তাই পরিবারের সান্নিধ্য পেয়েছে খুব কম। জেল থেকে বের হয়ে এবার বাড়িতে। বাবাকে দেখে খুশিতে আত্মহারা হাচু। নির্বাক তাকিয়ে শেখ কামাল । নিজের বাবাকে না দেখতে দেখতে ভুলে গেছেন যে তিনি তার বাবা। কামাল হাচিনাকে বলছে‘‘হাচু আপা, তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা বলি।’
বাড়ি থেকে ফিরে চীন ভ্রমন। তারপর আওয়ামীলীগের ম্যানিফেস্টো প্রস্তুত। এবার আওয়ামীলীগ শক্তিশালী বিরোধী দল। নির্বাচন ঘনিয়ে আসলো। দেশে শসনতন্ত্র আসলো না। অন্যদিকে মুজিব কুষ্টিয়াতে সভায়। মুজিবের সমর্থন না থাকার পরেও হক সাহেব ও ভাসানী যুক্তফ্রন্ট করে ফেললেন।
যুক্তফ্রন্টকে নিয়ে শুরু হলো নিবাচনী প্রচারনা। টাকাকড়ি নেই তবে জনমত আছে মুজিবের পক্ষে। জনগন নিজের জমানো টাকা উল্টো বঙ্গবন্ধুর হাতে তুলে দিতে শুরু করলো। ফলাফল যুক্তফ্রন্টের নিরষ্কুশ বিজয়। এবার মন্ত্রীত্ব নিয়ে দানা বাধতে শুরু করেছে যুক্তফ্রন্টের নেতা হক সাহেব ও শহীদ সাহেবের নেতা কর্মীদের মাঝে। সুযোগ খুঁজতে থাকলো মুসলিম লীগাররা। বঙ্গবন্ধু পেলেন কো- অপারেটিভ ও এগ্রিকালচার ডেভেলপমেন্ট দফতর। মুজিব একদিকে শপথ নিলেন তো অন্যদিকে আদমজী জুট মিলে বাঙ্গালী অবাঙ্গালীদের মধ্যে চক্রান্তের দাঙ্গা শুরু হলো। মুজিব সরাসরি সেখানে উপস্থিত হলো, বক্তৃতা করে পরিস্থিতি শান্ত করলো। মূলত নতুন সরকারের অক্ষমতা প্রদর্শন ই ছিলো চক্রান্তকারীদের উদ্দেশ্য।
কেন্দ্রীয় সরকার ৯২(ক) ধারা জারি করেছে। মন্ত্রিসভা বরখাস্ত করা হয়েছে। হক সাহেবকে রাষ্ট্রদ্রোহী , মুজিবকে দাঙ্গাকারী বলে রটনা করা হচ্ছে। গ্রেফতার করা হলো। যুক্তফ্রন্টের নেতারা চুপ, অনেকে হাত মিলিয়েছে চক্রান্তকারীদের সাথে মন্ত্রীত্বের আশায় । মামলা চলে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত। অবশেষে রায় হলো। রায়ে বলা হলো যে ‘ আমাাকে(মুজিবকে) শান্তিভঙ্গকারী না বলে শান্তিরক্ষকই বলা যেতে পারে।’
- কিংশুক পার্থ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

